ইউটিউব : তিনবন্ধুর বিশ্বজয়ী ভিডিও প্ল্যাটফর্ম তৈরি গল্প

ইউটিউবে আমার সবাই কমবেশি সময় কাটাই। কয়জন জানি ইউটিউব তৈরির গল্প?
তিনবন্ধুর বিশ্বজয়ী ভিডিও প্ল্যাটফর্ম তৈরি গল্প

পড়াশোনা, সংবাদ থেকে শুরু করে মানুষকে হাঁসিয়ে বিনোদন দেয়া, পুরো পৃথিবী এখন নির্ভরশীল ভিডিও এর উপর। আর আমাদের বর্তমান এই অভ্যাসের নেপথ্যে রয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান, নাম তার ইউটিউব। আজকের আর্টিকেল আলোচনা করব তিন বন্ধুর দারুন এক অগ্রযাত্রায় প্রস্তুত আজকের ইউটিউবের উত্থান পতন এবং সফলতার গল্প!

ইউটিউবের অনুপ্রেরণা

অন্যসব বড় বড় কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতাদের মত ইউটিউব এর তিন প্রতিষ্ঠাতাদেরও দেখা হয়েছিল একটি নতুন স্টার্টআপ কোম্পানিতে কাজ করার সময়। আর শুনতে চান সেই স্টার্টআপ কোম্পানি কোনটি? ইলন মাস্কের পেপাল! ইলন মাস্ক ছিলেন পেপালের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

স্পেস এক্সের প্রতিষ্ঠাতা, তৎকালীন পেপালের সিইও ইলন মাস্ক
স্পেস এক্সের প্রতিষ্ঠাতা, তৎকালীন পেপালের সিইও ইলন মাস্ক, Image From: Business Insider

সেই সময় ইলন মাস্কের অধিনে চাদ হারলি, স্টিভ চেং এবং জায়েদ করিম ইউটিউবের এই তিন প্রতিষ্ঠাতা চাকরি করতেন। তবে ২০০২ সালের অক্টোবর মাসে যখন পেপালকে ইবে ডট কম ১.৫ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়; তখন পেপালে কর্মরত এই তিনজন বন্ধু চাদ হারলি, স্টিভ চেন এবং জায়েদ করিম রাতারাতি মিলিয়নিয়ার বনে যান। আর তাদের জন্য এটা ছিল অনেক বড় পাওয়া, কেননা তারা সবাই ছিল কলেজ ড্রপআউট।

ইউটিউবের তিন প্রতিষ্ঠাতা
ইউটিউবের তিন প্রতিষ্ঠাতা , Image From: eldiariony.com

চাদ হারলি ছিলেন একজন ডিজাইনার তাই তিনি পেপাল ছাড়ার পর আলাদা কিছু প্রোজেক্টে কাজ শুরু করেন। যেমনঃ ব্যাগ ডিজাইন, একটি ফিচার সিনেমায় কাজ। অন্যদিকে জায়েদ করিম অনলাইনে তার ডিগ্রি সম্পন্ন করে নেন। তবে স্টিভ চেন কিছু কাজে আরো ১-২ বছর পেপালের সাথেই থেকে যান।

যাই হোক, তাও কোনভাবে এই তিনবন্ধুর প্রায় প্রায়ই দেখা হত এবং তারা তাদের নিজেদের কোম্পানি খোলার ব্যাপারে সবসময় আলোচনা করতেন। তবে মজার ব্যাপার হল এই তিন বন্ধুর ইউটিউব তৈরির পেছনে একেক জনের একেক অনুপ্রেরনা ছিল। কেউ হয়ত তাদের প্রিয় স্টারের ফাংশন অনলাইনে দেখতে পাচ্ছিল না বলে, আবার কেউ বড় বড় ভিডিও ফাইল অনলাইনে পাঠাতে পাচ্ছিল না বলে। আর এসব কারন কিংবা বলতে পারেন প্রয়োজনগুলোই ছিল তাদের ইউটিউব তৈরির পেছনে অনুপ্রেরণা।

মার্ক জাকারবার্গ যেমন হটওরনট ডট কম ওয়েবসাইট দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিল; তারাও সেই একই ওয়েবসাইট দেখে অনুপ্রানিত হন। হটওরনট ডট কম মূলত এমন একটি ওয়েবসাইট যেখানে ছেলে এবং মেয়ের প্রোফাইল থাকতো, যেখানে যেকেউ সেই প্রোফাইলগুলো হট অথবা নট হিসেবে রেট করতে পারত। মার্ক জাকারবার্গ এটা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ফেসম্যাস ডট কম তৈরি করেছিলেন। যদিও কয়েকদিনের মাথায় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জাকারবার্গের ওয়েবসাইট বন্ধ করতে বাধ্য করে। তবুও সেই ফেসম্যাসের সোর্স কোড থেকেই আজকের ফেসবুকের সৃষ্টি! তো আমাদের এই ইউটিউবের তিন প্রতিষ্ঠাতাও হটওরনট ডট কমের কনসেপ্ট থেকে ভেবেছিলেন তারাও এরকম একটা ওয়েবসাইট খুলবেন, যেখানে মানুষ তাদের ডেটিং এর ভিডিও আপলোড করবে এবং অভিজ্ঞতা শেয়ার করবে।

ইউটিউবের সূচনা

তবেকিছুদিন পরেই তারা এই চিন্তা বাদ দিয়ে একটি সার্বিক ভিডিও শেয়ারিং প্লাটফর্মের কথাভাবা শুরু করেন। ২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাদের সাইট ইউটিউব ডট কম ডোমেইনটি সচল হয়। অতঃপর কিছুদিন পর প্রতিষ্ঠাতা জায়েদ করিম তাতে তার চিড়িয়াখানার ঘোরার ভিডিও দেন; যেটা হয় ইউটিউবের প্রথম ভিডিও। তারপর ২০০৫ সালের মে মাস থেকে ইউটিউব সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়। সেসময় গুগলেরও নিজস্ব ভিডিও আপলোডিং সুবিধা ছিল। তবুও ইউটিউবই দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছিল।

পেপালের মত ইউটিউবও শুরু থেকে অনেক সফল হয়েছে। ইউটিউবের সৌন্দর্য ছিল এর সাধারনতা! মানুষ এখানে সহজেই ভিডিও আপলোড করতে পারত, আর ভিডিও আপলোড করতে পারত যত খুশি তত! তবে যেহেতু তারা তখনও ইউটিউবকে কোন মুনাফা অর্জনের ব্যবস্থায় নিয়ে যেতে পারেনি, তাই তাদের প্রতিদিন এই প্ল্যাটফর্ম চালাতে খুব সহজেই টাকা ফুরিয়ে আসছিল।

রয়েলফ বোথা, Image From: Nfx Signal

আর এইসময় এই তিন বন্ধুকে সাহায্য করে তাদের আগের পেপাল কমিউনিটি। পেপালের তৎকালীন চিফ ফিন্যান্স অফিসার রয়েলফ বোথা সেই বছরেরই সেপ্টেম্বর মাসে ইউটিউবে ৩.৫ মিলিয়ন ডলার ইনভেস্ট করে। রয়েলফ বোথা সেই ইনভেস্ট না করলে হয়ত ইউটিউব সেই সময়ই ঝরে পরত!

জনাব রয়েলফ বোথা’র এই ইনভেস্টমেন্ট এবং তিন বন্ধুর কঠোর পরিশ্রমে সেই বছরেরই নভেম্বর মাস নাগাদ ইউটিউব সবচেয়ে বড় ভিডিও প্লাটফর্ম হিসেবে অনলাইনে স্থান দখল করে নেয়। তবে সার্ভার কস্ট এতো বেড়ে যায়যে ৬ মাসের মাথায় তাদের অর্থ সংকট দেখা দেয়। কেননা তাদের প্লাটফর্মে দিনে বহু মানুষ গড়ে প্রায় ২ মিলিয়ন ভিডিও দেখত। তবে সেসময় আরেকটি ইনভেস্টিং কোম্পানি তাদের ৮ মিলিয়ন ডলার ইনভেস্ট করে।

গুগলের ইউটিউব কিনে নেয়া

২০০৬ সালের অক্টোবর মাস নাগাদ নিঃসন্দেহে ইউটিউব ভিডিও প্লাটফর্মের প্রতিযোগিতায় তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী গুগলের চেয়ে এগিয়ে ছিল। আর তখন গুগল ইউটিউব প্রতিষ্ঠাতা তিন বন্ধুকে তাদের এই প্লাটফর্মট বিক্রি করে দেয়ার জন্য অফার করে। আর তিন বন্ধু তাতে রাজিও হয়ে যায়। গুগল ১.৫ বিলিয়ন ডলারে ইউটিউবকে কিনে নেয়। বাস্তবিক অর্থে গুগল তখন সেই ওয়েবসাইটের জন্য ১.৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছিলো, যে ওয়েবসাইট সে পর্যন্ত একটি টাকাও উপার্জন করতে পারেনি। তবে গুগল জানত তারা খুবই ভালো একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে এবং তাদের ওয়েবসাইট গুগল এর মত তারাও ইউটিউবকে একটি অনন্য ওয়েবসাইট ভাবত।

গুগলের ইউটিউব কিনে নেয়া
গুগলের ইউটিউব কিনে নেয়া

গুগল ইউটিউব কে কিনে নেয়ার পরই তাদের শক্তিশালী আইনজীবী বাহিনীদের দ্বারা ইউটিউব এর সকল কপিরাইট জনিত সমস্যা সমাধান করে নেয়। আর এর মধ্যে তারা ইউটিউব এর জন্য সনির মত বড় বড় কিছু কোম্পানির সাথে বিজ্ঞাপন চুক্তি সই করে। আর গুগল এর সহযোগিতায় ইউটিউব এর মধ্যে নিজস্ব কপিরাইট সিস্টেম, কনটেন্ট আইডির মত প্রযুক্তি তৈরি করে। যা মাধ্যমে কোন ভিডিও আপলোড হলে একা একাই তার নিজস্ব একটি কপিরাইট লাইসেন্স তৈরি হয়ে যাবে। আর এরপরে অন্যসকল ভিডিও এবং কনটেন্ট এর সাথে সেই ভিডিওটি বরাবরই আলাদা থাকবে। আর সেই কারনে আজও পৃথিবীর সবচেয়ে ভিডিও শেয়ারিং ওয়েবসাইট হলেও ইউটিউব আজও আসল ক্রিয়েটর দের জন্য কপিরাইট মুক্ত। একজন আসল ক্রিয়েটর সহজেই তার নিজের কনটেন্ট এর কপিরাইট দাবি করতে পারেন।

ইতিমধ্যে ইউটিউব এর গুগল এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার আগে, তাদের একদিনের সার্ভার খরচই অনেক সময় মিলিয়ন ডলারের কাছে ছিল। তবে গুগল এর বিশাল ডাটা সেন্টার এর সাথে সংযুক্তি এর ফলে তারা সারবিকভাবেত তাদের সার্ভার খরচকে অনেকাংশে কমিয়ে ফেলেছিল। আর ইউটিউবএর সবচেয়ে বড় বিপ্লব আসে, গুগলের বিজ্ঞাপন ফার্ম এডসেন্স কে ইউটিউব এর সাথে সংযুক্ত করার মাধ্যমে।

বিজ্ঞাপন সেক্টরে গুগল এর ইতিমধ্যে অনেক সফলতা ছিল কেননা, গুগল এর কাছে ছিল অনেক বেশি তথ্য। কোথায় কোন বিজ্ঞাপন দেখাতে হত তাদের সার্ভিস সেটা খুব ভালো করে জানত। আর ইউটিউব এর সাথে তাদের এই এদসেন্সএর সংযুক্তি তাদের এই বিজ্ঞাপন সেক্টরকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করেছিল। ইউটিউব এর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল কপিরাইট সম্পর্কিত আইনি ঝামেলা এবং মানিটাইজেশন; তবে গুগল এর সাথে যুক্ত তারা তাদের এই বড় দুইটি সমস্যা সমাধান করে ফেলেছিল।


২০০৯ সালে দেখা গেলো পুরো মাস জুড়ে মানুষ প্রায় ৫ বিলিয়ন ভিডিও দেখেছে। তবে সেসময় ইউটিউব এর সার্ভার খরচ এর হিসেবে বিজ্ঞাপন থেকে খুব কম টাকা আসতো। সে বছর ইউটিউব ৪৭০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি করেছিল। তবে গুগল এর কাছে অর্থের চাইতেতথ্য বেশি দামি। আর সেই কারনে তারা এই বিষয়টি বেশি কিছু ভাবেনি। তবে কেবল চিড়িয়াখানায় ঘোরা বা বিড়ালের ভিডিও আপলোড করেই তো হবেনা। ইউটিউব মূলত চাচ্ছিল টেলিভিশনকে রিপ্লেস করতে। সেসময় যদিও বিভিন্ন সিরিজ এবং সিনেমার বিজ্ঞাপন ইউটিউবে দেয়া হচ্ছিল, তবে আসল কন্টেন্টটি কেউ ইউটিউবে আপলোড করত না। আর সেই কারনে ২০১৩ সালে ইউটিউব বিভিন্ন প্রোডাকশন হাউজ এবং সেলিব্রেটিদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের নিজস্ব সিনেমা এবং সিরিজ বানানো শুরু করে। যার জন্য গুগল সে সময় ৩০০ মিলিয়ন ডলার ইনভেস্ট করেছিল। আর এই থেকে গুগল সে বছর থেকে ইউটিউব এর সাবস্ক্রিপশন প্রোগ্রাম চালু করে। সেই সাবস্ক্রিপশন প্রোগ্রামের অংশ হলে, বাইরের অতিরিক্ত কোন বিজ্ঞাপন আসবে না এবং এরকম ইউটিউব এর অরিজিনাল কন্টেন্ট উপভোগ করা যাবে। তবে প্রথমদিকে ইউটিউব এর এই পেইড সাবস্ক্রিপশন প্রোগ্রাম ছিল কেবল মিউজিক স্ট্রিমিং এর জন্য। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে নতুন সেবা ইউটিউব রেড এর সাথে একত্রীভূত হয়ে যায়।

ইউটিউব রেড এর মাধ্যমে পুরো ইউটিউব ব্যবহারকারীরা বিজ্ঞাপন মুক্ত তো হবেই,পাশাপাশি এতে ইউটিউব এর নিজস্ব কিছু এক্সক্লুসিভ কনটেন্টও উপভোগ করা যাবে। তবে ২০১৬ সালের শেষের দিকে দেখা গেলো এই ইউটিউব রেড প্রোগ্রামের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা মাত্র ১.৫ বিলিয়ন! এডব্লকারের যুগে কেউ যে কেবল বিজ্ঞাপন মুক্তির জন্য এমনপেইড প্যাকেজে যাবে না, এটা তারই প্রমান দেয়।

২০১৭ সালের শুরু দিকে ইউটিউব আরেকটি বড় সমস্যায় পরে। যেখানে দেখা যায়, ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল নামক আমেরিকার বড় একটি পত্রিকা একটি আর্টিকেল প্রকাশ করে। আর সেই আর্টিকেল উল্লেখ্য করা হয়, ইউটিউবে এমন কিছু সেনসিটিভ কনটেন্টে বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে যা খুবই প্রশ্নবিদ্ধ! যেমন ইউটিউবে একটি প্র্যাঙ্ক ভিডিও কিংবা একটি সামাজিক কোনগুরুত্বপূর্ণ আলোচিত ভিডিওতে মানুষ বিজ্ঞাপন কেন দেখবে? আর সেই সব বিজ্ঞাপনের থেকে মূল বিজ্ঞাপনদাতাদের লাভ হচ্ছে না বলে উল্লেখ্য করা হয় সেই আর্টিকেলে। এতে ইউটিউবের তৎকালীন অনেক বড় বড় বিজ্ঞাপনদাতারা সহমত প্রকাশ করে, যা ইউটিউবের জন্য ক্ষতির কারন হয়ে দাড়ায়। আর তারপরই ইউটিউব এর মানিটাইজেশন পদ্ধতিতে একটি বিরাট পরিবর্তন আসে এবং তারপরই তারা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর দের বিভিন্ন প্রোডাক্টিভ বিষয়ে ভিডিও তৈরির জন্য বেশি জোর দেয়।


Featured Image by freestocks.org from Pexels