সিনেমা যেভাবে শতকোটি টাকা আয় করে!

সিনেমা যেভাবে শতকোটি টাকা আয় করে!
সিনেমা যেভাবে শতকোটি টাকা আয় করে! Image Source: Evolvapro.com

পৃথিবীতে বিনোদন শিল্পের অনেক বড় একটি স্থান জুড়ে রয়েছে সিনেমা শিল্প। আমরা অবসর সময়ে অনেক সিনেমাই দেখি। সবসময়ই পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও একটি করে নতুন সিনেমা রিলিজ হচ্ছে। যারা মনে করেন সিনেমা তৈরির একটি মাত্র কারন কেবল মানুষকে কোন বিষয়ে বিনোদন বা শিক্ষা দেয়া, আর কোন কারন নেই, তবে তারা অনেক বড় একটি ভুলের রাজ্যে বসবাস করছেন। একটি সিনেমা তৈরির মূল কারন হচ্ছে ব্যবসা। সিনেমা বলতেই বাণিজ্যিক ব্যাপারটা চলে আসে।

একজন সিনেমা পরিচালক সিনেমার ভেতর শিক্ষামুলক বিষয় দিয়ে তা বিক্রি করে ব্যবসা করবেন; নাকি হাসির বিষয় দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে ব্যবসা করবেন সেটা তার ব্যাপার। যদি একজন পরিচালক মনে করেন, তিনি এই বিষয়টি নিয়েসিনেমা বানালে মানুষ তার সিনেমা বেশি দেখবে এবং তার ব্যবসা বেশি হবে, তবে সেই পরিচালক সেই বিষয় বা গল্প নিয়ে সিনেমা বানাবে। একটি বিষয়, প্রতিটি সিনেমা বানানোর মুখ্য উদ্দেশ্য তা বাণিজ্যিক ভাবে সফল করে তোলা। একটি পরিচালক চান তার সিনেমা মানুষের কাছে অনেক বেশি জনপ্রিয় হোক, এই ব্যাপারটি দ্বারাই তিনি বোঝান তার সিনেমা বেশি ব্যবসাসফল হোক।

এই আর্টিকেলে আপনি জানতে পারবেন, কিভাবে একটি সিনেমা থেকে পরিচালক শত কোটি টাকারও বেশি আয় করতে পারেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের কথা যদি চিন্তা করি, তবে সেখানে দেখা যায় কোনো সিনেমা হলে একই সিনেমার জন্য টিকেট ১০০ রুপি, আবার কোন সিনেমা হলে সেই সিনেমার টিকেট এর মূল্য ৫০০ রুপি। তো আসলে এই টিকেট এর টাকাগুলো কিভাবে বণ্টন হয়ে থাকে? আর কিভাবেই একটি সিনেমা এতো টাকা আয় করে সেই বিষয়টি আমাদের মাথায় অনেক সময় চিন্তার খোঁড়াক জাগায় হয়ত।

অনেক সময় কেবল সিনেমার চুক্তি বিক্রি করেই সিনেমা রিলিজ হওয়ার আগেই পুরো সিনেমার টাকা তুলে নেয়া যায়।

আর অবশ্যই আপনি বাংলাদেশ এর সিনেমা শিল্প তথা ঢালউডকে এখানে আনবেননা, কেননা আমাদের দেশে সিনেমার আয় করার মূল জায়গাটিই নেই, আর সেটি হচ্ছে সিনেমা হল। এখানে এই ব্যাপারটি তুলে ধরা হবে হলিউড এবং তারপর দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বলিউড এর আলোকে।

সিনেমা তৈরি

আমাদের আগে জানা উচিত একটি সিনেমা তৈরিতে টাকা যায় কোথায় কোথায়। একজন পরিচালককে সিনেমা তৈরি করার জন্য প্রথমত একটি ভালো গল্প তৈরি করতে হয়, যা দিয়ে সে পুরো সিনেমাটা দাড় করাবে। তাকে ঠিক করতে হয় কাস্ট, অর্থাৎ তিনি তার সিনেমাতে কোন কোন অভিনেতা এবং অভিনেত্রীকে নিবেন। আর স্বাভাবিক জনপ্রিয় অভিনেতা এবং অভিনেত্রীদের নিলে, মানুষ সিনেমা দেখার আগে গল্পের কথা ভাব্বে কম, বরং তাদের দেখার জন্য হলেও অন্তত পক্ষে সিনেমা হলে সিনেমাটি একবার দেখে আসবে। অন্যদিকে কোন জনপ্রিয় অভিনেতা না হলে মানুষ টাকা খরচ করে সেই সিনেমা দেখার জন্য সিনেমাহলে যেতে উৎসুক হবে না।

আর সেকারনেই ভালো ভালো কাস্ট এর জন্য একজন পরিচালককে অনেক টাকা খরচ করতে হয়। তারপর লেখক, প্রোডাকশন, ক্যামেরা, বিভিন্ন দেশ ও লোকেশন, থাকা খাওয়া আবার সিনেমা সুট করার পর সেই সিনেমার এডিটিং; ইত্যাদি মিলিয়ে হলিউড-বলিউডের নামি দামি একেকটি সিনেমার প্রায় শতকোটি বা এর কম বা বেশি খরচ পরে যায়। এখন একজন সিনেমা পরিচালক তার সিনেমা ৯৫ কোটি টাকা দিয়ে বানিয়ে একটি হার্ডডিস্কের ভেতর ভরালেন, এখন কিভাবে সে সেই হার্ডডিস্কটি বিক্রয় করবেন দিগুন,তিনগুন দামে, ২০০ কোটি বা ৩০০ কোটিতে সেটাই হচ্ছে আসল খেলা।

ডিসট্রিবিউটর এবং সিনেমার ডিসট্রিবিউশন

সিনেমা ডিস্ট্রিবিউটর হল একটি বিশেষ ধরনের কোম্পানি, যারা একটি সিনেমার মার্কেটিং এর মূল দায়িত্ব দেখে। সিনেমার পরিচালকের কোম্পানিকে সাধারণত বলা হয় প্রোডাকশন কোম্পানি। আর ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানিগুলো সাধারণত এসব প্রোডাকশন কোম্পানি থেকে ভিন্ন হয়। আর এরা একটি সিনেমার মূল অর্থনৈতিক ব্যাপারটি দেখে। তবে পরিচালকের নিজেরই একটি ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানি থাকতে পারে তবে এই ব্যাপারটি খুব কম হয়। একজন ভালো সিনেমা পরিচালক এতো ঝামেলার ভেতর যেতে চান না। ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানিগুলো ঠিক করে দেয় কবে সিনেমাটি রিলিজ হবে। আর তারা এটাও ঠিক করে যে ঠিক কি কি মাধ্যমে সেই সিনেমাকে মানুষের মাঝে দেখানো হবে।

এখানে সিনেমার পরিচালক এবং ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানির ভেতর দুটো বিষয় ঘটে। অনেক সময় পরিচালক হয়ত তার ১০০ কোটি টাকার সিনেমা ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানির কাছে দিগুন দামে যেমন ২০০ কোটি টাকায় বিক্রয় করে দেয়। এতে দেখা যায় সিনেমা রিলিজ হওয়ার আগেই যারা সিনেমা তৈরি করল, অর্থাৎ পরিচালক বা তার প্রোডাকশন কোম্পানি তারা লাভবান হয়ে চলে যায়। এখন সিনেমাটি কিভাবে ডিস্ট্রিবিউটর ডিস্ট্রিবিউট করে ব্যবসা করবে, সেটা তাদের ব্যাপার হয়ে দাড়ায়। আরেকটা ব্যাপার হয় যে, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত, ধরলাম ১ মাস বা ২ মাস ব্যাপি সিনেমাটি চলবে সকল সিনেমা হলে হলে। এতে করে যা আয় হবে তা পরিচালক এবং ডিস্ট্রিবিউটর একটি নির্দিষ্ট শতকরা হারে বণ্টন করে নিবে।

একটি ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানিরও অনেক খরচ হয়। যেমন তারা প্রতিটি বড় বড় বাজেট সিনেমার জন্য অন্তত ১০-১৫ কোটি টাকার বাজেট রাখে। এসব টাকা দিয়ে তারা সিনেমার পোস্টার, জায়গায় জায়গায় বড় বড় বিলবোর্ড, বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের সিনেমার প্রোমোশন ইত্যাদি কাজ করে থাকে। আপনি ভাবছেন কেবল সিনেমা হলে রিলিজ এবং মানুষকে সিনেমা হলে আনার জন্যই এতকিছু? না, একদম না। তারা সিনেমা হলে রিলিজ করার আগেই এসব সিনেমা থেকে অনেক টাকা আয় করে নেয়। যেমন ধরুন একটি নতুন সিনেমার অনেকগুলো গান রয়েছে। এসব গান বিভিন্ন চ্যানেলে চলে, এসব চ্যানেল সেই নতুন সিনেমার গান তাদের চ্যানেলে চালানোর জন্য এইসব ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পনিকে টাকা দিতে হয়। আবার ধরুন সেই সিনেমার নতুন কোন গান কোন মোবাইলফোন অপেরাটর কলার টিউন হিসেবে নিলো, সেখান থেকে ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানি টাকা আয় করে।

আবার আমরা দেখি সিনেমা রিলিজ হওয়ার অনেকদিনপরে সেটা টেলিভিশনে আসে ওয়ার্ল্ড টেলিভিশন প্রিমিয়ার হিসেবে। অর্থাৎ টেলিভিশনে সেই সিনেমাটি প্রথম দেখানো হচ্ছে। তো কোন চ্যানেলে সেই সিনেমাটি প্রথম দেখানোর জন্য পাবে, সেই চুক্তিও সিনেমা রিলিজ হওয়ার আগেই হয়ে থাকে। যার মানে দাড়াল সিনেমা রিলিজ হওয়ার আগে কেবল চুক্তি বিক্রি করেই ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানি বিপুল পরিমাণ টাকা আয় করে নেয়। অনেক সময় এসব চুক্তি বিক্রি করেই সিনেমা রিলিজ হওয়ার আগেই পুরো সিনেমার টাকা তুলে নেয়া যায়। আর একারনেই দেখা যায়, অনেক সিনেমায় গানের পরিমাণ অনেক বেশি, তারা সিনেমায় গান বেশি দেয় এটাও একটি ইনভেস্ট। যদিও পরে গিয়ে দেখা যায় কাহিনী ততটা ভালোনা। এই ব্যাপারটা বলিউড,টলিউডে হয় বেশি। ফক্স স্টার স্টুডিও, ইয়াস রাজ ফিল্মস, ধারমা ইত্যাদি হল কিছু জনপ্রিয় সিনেমা ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানি।

সিনেমা হল

অতঃপর এসব সিনেমা ডিস্ট্রিবিউটর তাদের সিনেমা নিয়ে বিভিন্ন দেশ এবং অঞ্চলের নানা ছোটো বড় সাব ডিস্ট্রিবিউটর এর কাছে চলে যায়। এসব সাবডিস্ট্রিবিউটররা সেই এলাকার সবগুলো সিনেমাহল নিয়ন্ত্রন করে। তারা নিয়ন্ত্রন করে, কোন সিনেমা কখন চালানো হবে, কোথায় চালানো হবে, কবে কোন হলে চালানো হবে এসব বিষয়। অতঃপর সাবডিসট্রিবিউটরের মাধ্যমে সিনেমা হল থেকে ইনকামের নির্দিষ্ট শতাংশ আয় মূল ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে এসে পৌছায়। আর এভাবেই মূলত একটি সিনেমা শতকোটি আয়ের ঘরে প্রবেশ ঘটে!

তো আপনি কি সিনেমা শিল্প নিয়ে কৌতুহলী ছিলেন?